মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ইদ্রকপুর কেল্লা

 

কিভাবে যাওয়া যায়: 
ঢাকার গুলিস্তান থেকে “ঢাকা ট্রান্সপোর্ট” বা “দিঘীরপাড় ট্রান্সপোর্ট” এর মাধ্যমে মোক্তারপুর। মোক্তারপুর থেকে অটো রিক্সায় ১০ টাকা (জন প্রতি) বা রিক্সা যোগে ২০-২৫ টাকায় ইদ্রাকপুরের কেল্লায় যাওয়া যায়।

 

 

সংক্ষিপ্ত : মুন্সীগঞ্জ শহরের প্রান কেন্দ্রস্থলে ইদ্রাকপুর কেল্লা অবস্থিত। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সেনাপতি ও বাংলার সুবেদার মীর জুমলা কর্তৃক ১৬৬০ সালে বিক্রমপুরের এই অঞ্চলে ইদ্রাকপুর কেল্লা নামে এই দুর্গটি নির্মিত হয়। মগ জলদস্যু ও পর্তুগীজদের আক্রমন হতে এলাকাকে রক্ষা করার জন্য এই দূর্গটি নির্মিত হয়। জনশ্রুতি আছে এ দূর্গের সাথে ঢাকার লালবাগের দূর্গের সুড়ঙ্গ পথে যোগাযোগ ছিল। বহু উচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত এই গোলাকার দূর্গটি এলাকায় এস.ডি.ও কুঠি হিসাবে পরিচিত। ঐতিহাসিক এই দূর্গটি সংস্কার করা একান্ত প্রয়োজন।

 

 

বিস্তারিত : ইদ্রাকপুর কেল্লা

 

সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মোগল বাদশাহ আওরঙ্গজেবের আমলে এই নির্মিত হয়। দুর্গটি মুন্সীগঞ্জ শহরে দক্ষিণ প্রান্তে অবিস্থত। আয়তনে বৃহৎ না হলেও আমাদের বিস্মৃত প্রায় ইতিহাসের অনেক মূল্যবান তথ্য এর প্রতিটি ইটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। রক্ষিত কীর্তি হওয়া সত্ত্বেও রক্ষনাবেক্ষণের অভাবে দুর্গটির সম্পূর্ণ অবয়ব অক্ষত নেই, অনেক অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। দুর্গের প্রধান অংশটুকু আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীর বেষ্টিত এই অংশটুকু দেখে সহজেই বোঝা যায় ঐটি একটি দুর্গ।

দুর্গটি মুন্সীগঞ্জ শহরের একটি উম্মুক্ত স্থানে অবস্থিত। দুর্গটির চারদিকে পূর্বে কি ছিল তা আমাদের জানা নেই। বর্তমানে দুর্গটির উত্তরে পুর্ব-পশ্চিমে একটি রাস্তা চলে গেছে। দক্ষিণে পল−ী গ্রাম, পূর্বে শহীদ ময়দান, পশ্চিমে এ ভি, জে, এম সরকারী বালিকা বিদ্যালয়। দুর্গের সম্পূর্ণ অংশ আজ আর নেই। যেটুকু আছে তা সুউচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত একটি সম্পূর্ণ দুর্গের মতোই পরিদৃষ্ট হয়। ষাট বছরের অধিককার পূর্বে ১৯০৭-১০ খৃষ্টাব্দে তৎকালীন মহকুমা হাকিম শ্রী সুরেশ চন্দ্র সিংহ মহাশয়ের তত্ত্বাবধানে দুর্গের এই অংশের সংস্কার করা হয়। এর উত্তরে ও পশ্চিমে আধ মাইল পর্যন্ত সৈন্যাবাসের উপযুক্ত নাতির্দীর্ঘ কুঠুরী ও অট্টালিকার চিহ্ন দেখ পাওয়া যায়। হয়তো এরপরও দুর্গটি আরো প্রসারিত ছিল। দুর্গের বর্তমান ধ্বংসোম্মুখ প্রাচীর শ্রেণীর অস্তিত্ব যদি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যতের মানুষ দুর্গটি যে এতখানি প্রসারিত ছিল তা বিশ্বাসই করবেনা। এর থেকেও বলা যায় বর্তমানের চেয়ে মূল দুর্গের বিস্তার অধিক হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। দুর্গটি ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। উলে−খযোগ্য যে পূর্বে ইছামতী নামে যে নদীটি ছিল তা বর্তমানে ধলেশ্বরী নামে পরিচিতি। ইছামতী নামটির কোন ব্যবহারই এখন আর নেই। সর্বগ্রাসী নদী দুর্গটি গ্রাস করবার জন্য থাবা উদ্যত করেছিল। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে নদীর চর পড়ে দুর্গটি রক্ষা পায়। দুর্গটির দক্ষিণাংশ ও পূর্বাংশ বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তা খুবই আধুনিক বলে প্রতীয়মান হয়। এইসব স্থানের মাটির মাঝে বালুর ভাই বেশী। এতে এই প্রমানিত হয় যে দুর্গটি এককালে নদী তীরবর্তী ছিল। আজ উক্ত স্থান থেকে নদী বহু দুর চলে গিয়েছে।

দুর্গটির বর্তমনা অবস্থা দেখে এই প্রতীয়মান হয় যে, দুর্গটি যখন অক্ষত ছিল তখন দুর্গের বর্তমান অংশটি মুল দুর্গের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ছিল। দুর্গের মধ্য স্থলে একটি মসজিদ আছে। আনুমানিক ৮০/৮৫ বৎসর পূর্বে মসজিদটির সংস্কার হয়। দুর্গের চারিদিক যে পরিখা বেষ্টিত ছিল তা পরিস্কার বোঝা যায়। এর পূর্বদিকের পরিখার উপস্থিতি আজও আছে তবে পরিখা থেকে তা রূপান্তরিত হয়েছে একটি পুকুরে। এই জলাশয় থেকেই দুর্গের পূর্বদিকের প্রাচীর উত্থিত হয়েছে। দুর্গটির চারিদিক মজবুত প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। প্রাচীরের শীর্ষভাগ পদ্মপাঁপড়ির মতো। তার মাঝে ছিদ্র রয়েছে। ঐ ছিদ্র পথে কামান বন্দুকের নল স্থাপন করা হতো। প্রাচীর শ্রেণী বর্তমানে যে উচ্চতায় অবস্থান করছে পূর্বে তার চেয়ে বেশী উচ্চ ছিল। প্রাচীর শ্রেণী যুগ যুগ ধরে ক্রমশঃ মাটির নীচে বসে যাচ্ছে। দুর্গটির চার কোন প্রাচীর সংলগ্ন বৃত্তাকার চারটি মঞ্চ আছে। এই মঞ্চগুলোর দেওয়ালও ছিদ্রযুক্ত। এই অংশের প্রাচীর উচ্চতায় ৩ ফুট কি ৪ ফুটে পরিণত হয়েছে। এই উচ্চ মঞ্চগুলো নির্মাণের উদ্দেশ্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এই মঞ্চগুলো হতে শত্রুর নৌবহর পর্যবেক্ষণ করা খুবই সহজ হতো। দুর্গটির প্রবেশদ্বার একটি। দ্বারটি দুর্গের উত্তর দিকে অবিস্থত। এই তোরনটির উচ্চতা তের ফুট এবং প্রস্থ সাড়ে সাত ফুট। এই দুর্গটি নিতান্তই সামরিক আদর্শে নির্মিত। এতে কোন স্থাপত্য সৌন্দর্যের নিদর্শন নেই। কিন্তু এর গঠন প্রণালী অত্যন্ত দৃঢ় এর মাঝেও একটি Abvo¤^i সৌন্দর্য রয়েছে।

দুর্গটির মাঝে পূর্বদিকে ইটের তৈরী একটি টিলা আছে। এই টিলা পূর্বে খুবই উচু ছিল এবং এর উপর হতে প্রহরীরা শত্রুপক্ষীয় রণতরীর আগমন লক্ষ্য করতো। এই টিলাটিও ক্রমশঃ মাটির নীচে প্রেথিত হচ্ছে। বর্তমানে টিলাটির উচ্চতা ১৬ গজ। অনেকে মন্তব্য করেন দুর্গটির একাধিক তল ছিল। সেই তলগুলো ক্রমশঃ ভূ নিম্নে প্রেথিত হয়েছে।  

একাধিক তল থাকা মোটেই বিচিত্র নয়। কারণ সামরিক দিক থেকে এই দুর্গটির গুরুত্ব ছিল অসীম। এ স্থানেই প্রথম শত্রুপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটত। তাই প্রথম দর্শনেই শত্রুকে উচিত শিক্ষা দেবার মতো প্রচুর সৈন্য ও অস্ত্র, গোলা বারুদ মজুদ রাখবার জন্য একটি বিশাল দুগ্য নির্মাণ করাটাই যুক্তিযুক্ত। এই দুর্গ থেকেই আফগান, মগ, ফিরিঙ্গি ও আরাকানী প্রভৃতি শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা হতো। সুতরাং এখানে একটি ¯^ívqbZg দুর্গ প্রতিষ্ঠা নিশ্চয়ই মীরজুমলা করেননি। যাই হোক এই টিলাটির গঠন প্রণালী অতি সুন্দর। এরূপ সুউচ্চ ইষ্টক নির্মিত টিলা সচরাচর চোখে পড়ে না। টিলাটি বৃত্তাকার। টিলাটিতে আরোহনের জন্য বিশাল সোপান শ্রেণী রয়েছে। সোপানমালা টিলা থেকে ক্রমশঃ নীচে নেমে এসে একটি ছোট জলাশয়ে শেষ হয়েছে। এখানে উলে−খ করা যেতে পারে যে, টিলার সোপান শ্রেণী দুর্গের প্রবেশদ্বারমুখী নয়। সোপান শ্রেণী পশ্চিমমুখী আর দুর্গের সিংহদ্বারা উত্তরমুখী। যা হোক সোপানশ্রেণী স্তরে স্তরে বিন্যস্ত। একটি স্তর শেষ হবার পর আর একটি বিশাল সোপান তারপর আবার তদপেক্ষা ক্ষুদ্রকার সোপান গুচ্ছ, আবার আর একটি বিশাল সোপান, এইভাবে সোপানমালা নির্মিত, সোপানের দুইটি দ্বারাই উঁচু।

টিলাটির উপরিভাগ খিলানের উপর স্থাপিত। পূর্বে টিলাটি শূন্যে গর্ভ ছিল পরে তা বিষাক্ত সরীসৃপের আবাস স্থলে পরিণত হলে মাটি ও বালিদ্বারা গর্ত পূরণ করা হয়। টিলার মধ্যে প্রবেশের একটি মাত্র দ্বারা ছিল। দুর্গটি সংস্কারের পর ঐ দ্বারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঐ দ্বার থেকে টিলার তলদেশ পর্যন্ত সিঁড়ি ছিল। এই টিলার আয়তন কত বড় হবে তা আজও নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। এর ব্যাস হবে ২৫ গজ। 

এই টিলায় যুদ্ধের অস্ত্র-শস্ত্র এবং ধনরত্ন রক্ষিত হত বলে অনেকের ধারণা এবং সেই জন্যে একে দুর্গক্ষেত্রের ঠিক মাঝখানে স্থাপন করা হয়। কিংবদন্তী, এই যে, এই টিলার মধ্যে ধনাগার ছিল। সোপানাবলী সংলগ্ন উত্তর দিকে একটি গোলাকৃতি কুঠরী আছে। এইরূপ জনশ্রতি প্রচলিত যে ঐ কুঠরীতে বারুদ সঞ্চিত থাকত। টিলার দক্ষিণ পূর্বকোণে নিম্ন আয়তন সরু সিড়িপথ আছে। এই গুপ্তদ্বারটি নির্মাণ করার পেছনে তাদের নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য ছিল। কোন সময় আত্মরক্ষার প্রয়োজন মনে হলে এই গুপ্ত পথে পলায়ন খুবই সহজ ছিল।

দুর্গটির প্রাচীনত্ব নির্ণয় করা বিশেষ পরিশ্রম সাপেক্ষ নয়। ১৬৬০ খৃষ্টাব্দে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে বাংলার সুবোদার মিরজুমলা এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। টেইলর তার বিখ্যাত গ্রন্থ “টপগ্রাফি অব ঢাকা” তে এই দুর্গটির কথা উলে−খ করে গেছেন। দুর্গটি সংস্কারের সময় দুর্গটির দক্ষিণ পূর্ব দেয়ালে ইংরেজীতে ইদ্রাকপুর ফোর্ট কথাটি লিখিত হয়। ১৮৩০ খৃষ্টাব্দে মিঃ টেইলর মুন্সীগঞ্জে আসেন এবং দুর্গ পরিদর্শন করেন। তখন দুর্গটির পাশ দিয়ে ধলেশ্বরী প্রবাহিত হতো। তিনি দুর্গ সংলগ্ন ঘাট ও অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ দেখতে পেয়েছিলেন।

মীরজুমলা উক্তস্থানে দুর্গ নির্মাণ করে উচ্চ মানের সামরিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় প্রদান করেন। ইদ্রাকপুরের ভৌগলিক অবস্থা পর্যবেক্ষন করলে সহজেই বোঝা যায় যে, রাজধানী ঢাকা নগরীকে নৌ আক্রমন থেকে রক্ষা করার জন্য এইরূপ স্থানে দুর্গ নির্মাণ অপরিহার্য ছিল।

ঢাকা নগরী সুরক্ষিত রাখা ছাড়াও দুর্গ স্থাপনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল। আফগানীরা সুযোগ পেলেই পূর্ববঙ্গের উপর হামলা চালাত। পূর্ব বাংলার নদী তীরবর্তী এলাকায় ফিরিঙ্গি ও মগদের অত্যাচার, উৎপীড়ন, লুন্ঠন হরহামেশা লেগেছিল। এদেরকে দমন করার জন্য বিভিন্ন পন্থার আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়। এই বর্বর দস্যুদের সমুচিত শাস্তি দেবার জন্য ইদ্রাকপুর ও হাজিগঞ্জে দুর্গ স্থাপন করাও একটি উদ্দেশ্য। জল দস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করা এই স্থানে দুর্গ নির্মাণের সর্বপ্রধান কারণ বলে অনেক ঐতিহাসিক মত প্রকাশ করেছেন। ঐতিহাসিক গোলাম হোসেন ও “আলমগীর নামা” রচয়িতা মীর্জা মোহাম্মদ কাজেম লক্ষ্য ও ইছামতীর সঙ্গমস্থলে দুর্গ স্থাপনের এই কারণই ব্যক্ত করেছেন। মিঃ টেইলর লক্ষা ও ইছামতীর তীরে যে দুটি দুর্গের উলে−খ করেছেন বলাই বাহুল্য তা ইদ্রাকপুর দুর্গ ও হাজিগহ্‌জ দুর্গ।

ইদ্রাকপুরকে ঢাকার তোরণ বলে চিহ্নিত করাটা অযৌক্তিক নয়। জলপথে ঢাকা আক্রমণের এটাই ছিল একমাত্র পথ। ঢাকা নগরীকে শত্রু আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব ছিল ইদ্রাকপুর কেল্লার। ধলেশ্বরীর পশ্চিম পাড়ে ইদ্রাকপুর কেল্লা। আর অপর পাড়ে হাজীগঞ্জ কেল্লা। হাজীগঞ্জ কেল্লাটি অবশ্য কালের সঙ্গে সংগাম করে টিকে থাকতে পারেনি। তার ধ্বংসাবশেষ আজও পরিদৃষ্ট হয়। ইতিহাসের সাক্ষ্যবাহী এই দুই কেল্লা হতে বীর বিক্রমে আফগান, মগ, ফিরিঙ্গি ও আরাকানী প্রভৃতি শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা হতো।

অবস্থান: 
কাচারী, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সংলঘ্ন, মুন্সীগঞ্জ সদর, মুন্সীগঞ্জ।